প্রবাল জমছে না প্রবাল দ্বীপে
এগুলো সবই মৃত প্রবাল। সম্প্রতি সেন্টমার্টিন থেকে তোলা ছবি - প্রতিবেদকসেন্টমার্টিন বিপন্ন, ছেঁড়াদ্বীপও সংকটেজাহাজ থেকে দূরের দ্বীপটি দুপুরের প্রখর আলোয় ধূসর দেখাচ্ছিল। যতই কাছে আসছি কেয়াবনের সারি একটু একটু করে সবুজ হয়ে উঠছে। বুকের ভেতরে প্রবাল দ্বীপের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের মায়ায় ডুবে থাকার আকাঙ্ক্ষাও প্রবল হচ্ছিল। কিন্তু ধাক্কা খেতে হলো জাহাজ থেকে নেমে। জেটিতে দাঁড়িয়ে সামনে চোখ রাখতেই ময়লা-আবর্জনার স্তূপ, সঙ্গে বোঁটকা গন্ধ। জেটি পার হয়ে সামনের বাজারের অবস্থা আরও করুণ। গাদাগাদি করা খাবারের দোকান, চিৎকার চেঁচামেচি। মনে হলো কোনো দ্বীপ নয়, চিরচেনা কোনো গাঁয়ের হাট। সামনে এগোতে এগোতে চরম অব্যবস্থাপনার চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।এসব ছাড়িয়ে সবচেয়ে ভয়ংকর যে দিক, দ্বীপে আর প্রবাল জমছে না। কারণ, কোটি কোটি ক্ষুদ্র এই সামুদ্রিক জীব নিয়েই অপরূপ সৌন্দর্যের প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগে যেখানে ১ দশমিক ৩২ বর্গকিলোমিটারজুড়ে জীবন্ত প্রবাল ছিল, এখন সেখানে আছে মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৩৯ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ এরই মধ্যে দ্বীপের ৯৭ শতাংশ প্রবাল নেই হয়ে গেছে। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে এই দ্বীপে ৬৬ প্রজাতির প্রবাল আর প্রাণীর অস্তিত্ব থাকলেও এখন দশটিও টিকে নেই। পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে স্বনামধন্য গবেষক অধ্যাপক আইনুন নিশাত সমকালকে বলেছেন, প্রকৃতপক্ষে সেন্টমার্টিন আর প্রবালদ্বীপের চরিত্রে নেই, এখন নিছকই একটি পাথুরে দ্বীপ।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবাল না জমলে সর্ব দক্ষিণের ছেঁড়াদ্বীপটিরও অস্তিত্ব থাকবে না। অতিরিক্ত পর্যটকের ভিড়, অপরিকল্পিত স্থাপনা আর চরম অব্যবস্থাপনার কারণেই অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে সেন্টমার্টিন। একই সঙ্গে বাড়ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা আর সমুদ্রের উচ্চতা। ফলে সেন্টমার্টিনকে রক্ষা করা এখন বেশ জটিল হয়ে উঠছে। এসবের পরেও সেন্টমার্টিন ঘিরে প্রভাবশালীদের মৌসুমি ব্যবসা বাড়ছে। রিসোর্ট, রেস্টুরেন্টে সয়লাব হয়ে গেছে পুরো দ্বীপ।টেকনাফ থেকে প্রতিদিন সাতটি জাহাজ চলাচল করছে। এরই মধ্যে সম্প্রতি কক্সবাজার-সেন্টমার্টিনে চলাচলের জন্য দুই হাজারের বেশি যাত্রী ধারণক্ষমতার প্রমোদতরী চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। জাতীয় পর্যায় থেকে বারবার পর্যটন নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হলেও কোনো উদ্যোগই আসলে নেওয়া হয়নি। খোদ বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় জানাচ্ছে, দুই হাজার সাল পর্যন্ত সেন্টমার্টিন যেতেন দিনে গড়ে দুই থেকে তিনশ পর্যটক। এখন অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত কক্সবাজার ও টেকনাফ থেকে আটটি জাহাজে প্রতিদিন প্রায় চার হাজার পর্যটক যাচ্ছেন দ্বীপটিতে। পর্যটকদের প্রায় ৫০ শতাংশই রাত্রিযাপন করছেন।বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাভেদ আহমেদ সমকালকে জানিয়েছেন, সেন্টমার্টিনে পর্যটক নিয়ন্ত্রণ এবং ইকো ট্যুরিজম নিশ্চিত করতে জাতীয় পর্যায়ে কাজ চলছে। পরিকল্পনা রয়েছে মহেশখালী ও সোনাদিয়ায় পর্যটনের আধুনিক সুবিধা নিশ্চিত করে সেন্টমার্টিনের ওপর চাপ কমানোর।দ্বীপ ঘুরে যা দেখা গেল :রাত্রিযাপনের জন্য যেসব রিসোর্ট সেগুলোর ব্যবস্থাপনাও খুব ভালো নয়। দ্বীপের সবচেয়ে নামকরা দ্বিতল 'ব্লু মেরিন' রিসোর্টে গিয়ে এক রাতের জন্য পুরো টাকা আগাম পরিশোধ করে ছয় হাজার টাকায় যে কক্ষ বরাদ্দ পাওয়া গেল, সেই কক্ষে একজন সুস্থ মানুষের পক্ষে বেশিক্ষণ থাকা সম্ভব নয়। বিছানার চাদরে দাগ, কম্বলে আঁশটে গন্ধ, ছেঁড়া ও ময়লা তোয়ালে। বাথরুমের অবস্থা খুবই করুণ। প্লাস্টিকের বেসিনে জমে আছে ময়লা। আবর্জনার স্তূপ জমেছে জানালার পাশেই। আর বাজারের হট্টগোলে কান পাতা দায়।রিসোর্টে বসেই খবর পাওয়া গেল, দ্বীপের গলাচিপা অংশে বেশ কিছু নতুন রিসোর্ট হয়েছে। দ্বীপ ভ্রমণে বেরিয়ে সেই অংশে যেতে যেতে চোখে পড়ল রাস্তার দুই পাশে বাড়ি-ঘর। এখানেও 'সি ইন' নামে একটি দোতলা রিসোর্ট ভবন চোখে পড়ল। বসতি অংশ পেরিয়ে যে সরু সড়ক সেটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। রাস্তা দিয়ে দুটি রিকশাভ্যান পাশাপাশি পার হওয়াই দায়। রাস্তার দুই পাশে অনেকখানি নিচে ভূমি, যেন গিরিখাতের মাঝখান দিয়ে পাহাড়ি পথ। রাস্তায় কোনো সুরক্ষা প্রাচীর কিংবা রেলিং নেই। রিকশাচালক সিদ্দিকের কাছে জানা গেল, মাঝেমধ্যে রিকশাভ্যান উল্টে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।বিপজ্জনক রাস্তা গলাচিপায় নীল দিগন্তে রিসোর্টের অংশ পর্যন্ত। সেখানে ইটের রাস্তা পেরিয়ে মাটির রাস্তা। সেই রাস্তার পাশে নীল দিগন্তে ছাড়াও আছে কিংশুক, সায়রী নামে রিসোর্ট। এখান থেকে পশ্চিমের অংশজুড়ে বিচের পাশে গড়ে উঠেছে আরও কয়েকটি রিসোর্ট। দু-তিনটি রিসোর্ট ঘুরে দেখা যায়, কোনোটিই থাকার জন্য ততোটা মানসম্পন্ন নয়। তবে এগুলোর অবস্থা উল্লিখিত প্রথম রিসোর্টের চেয়ে কিছুটা ভালো। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এই রিসোর্টগুলোর সবক'টির মালিক ঢাকার। তাদের নিয়োগ করা কর্মচারীরা এগুলো চালাচ্ছেন। সবই চলছে অস্থায়ী ভিত্তিতে। রিসোর্ট এলাকায় মাছির প্রবল দাপট দেখে বোঝা গেল এখানকার পরিচ্ছন্নতার অবস্থা আসলে কী।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন